চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ এর আন্দোলন জোরালো হচ্ছে

বেকার জীবনবেকার জীবন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  12:04 AM, 25 January 2021

সুনামগঞ্জের ছাতক সিমেন্ট কারখানার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলামের মেয়ে কুলসুমা বেগম (৩০)। উপার্জনক্ষম আর কেউ না থাকায় টানাপড়েনের সংসার তাদের। অনেক কষ্টে এমএ পাস করার পর পরিবারের হাল ধরার স্বপ্ন দেখতেন কুলসুমা। এজন্য একে একে ৩০টি সরকারি চাকরির আবেদন করেন তিনি। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। পার হয়ে যাচ্ছিল চাকরির

বয়সসীমা। উচ্চ শিক্ষিত হয়েও পরিবারের পাশে দাঁড়াতে না পেরে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে গত ২৬ নভেম্বর সবার অজান্তে বাড়ির পাশের আমগাছের সঙ্গে ফাঁস নিয়ে আত্মাহুতি দেন দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকে। শুধু এক কুলসুমা বেগম নন, চাকরির বয়সসীমা পার হয়ে যাওয়ায় আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছেন অসংখ্য চাকরিপ্রত্যাশী। তারপরও বদলায়নি দৃশ্যপট।

দেশের নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে প্রথম শ্রেণির চাকরি তো দূরে থাক, অনেকের কপালেই জোটে না তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির একটা সরকারি চাকরি। পড়াশোনা শেষ করার পর ঝড়ো গতিতেই যেন ফুরিয়ে যায় ৩০ বছরের শিকলে বন্দি চাকরির আবেদনের সুযোগ। তাই তো এ শিকল ভাঙতে ক্রমে জোরালো হচ্ছে বয়সসীমা বাড়ানোর আন্দোলন। এরই ধারাবাহিকতায়

চাকরির বয়সসীমা ৩৫ বছরে উন্নীত করার দাবিতে গতকাল শুক্রবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগে পদযাত্রা করেছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ। আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দাবি মানা না হলে ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন সংগঠনের আহ্বায়ক মো. ইমতিয়াজ হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাবি

অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাসহ দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা কয়েকশ চাকরি প্রার্থী এই পদযাত্রায় অংশ নেন। পদযাত্রা থেকে ‘সারা বাংলায় খবর দে, ৩০ কে কবর দে’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হয়। ছাত্র পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক সোনিয়া চৌধুরী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছি। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডি

কার্যালয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করে ৩৫-এর যৌক্তিকতা তুলে ধরি। তিনি অতি দ্রুত চাকরির আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ করে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। এদিকে করোনা মহামারি চাকরি প্রার্থীদের হতাশা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, করোনার ধাক্কায় ২০২০ সালে

বড় কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়নি। এরই মধ্যে অনেকের চাকরির আবেদনের বয়স শেষ হয়ে গেছে। যদিও প্রজ্ঞাপন জারি করে সাময়িকভাবে বয়সের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দিয়েছে সরকার, কিন্তু সে হারে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আসছে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী বহু মানুষ কর্মহীন ও

চাকরিহীন হয়েছেন। একই সঙ্গে কমেছে চাকরির সার্কুলার ও আবেদনের হার। বাংলাদেশে ২০১৯ সালের এপ্রিলের তুলনায় ২০২০ সালের এপ্রিলে অনলাইনে চাকরির সার্কুলারের হার কমেছে ৮৭ শতাংশ। আর গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ

(৩৩ দশমিক ১৯ শতাংশ) পুরোপুরি বেকার। জানা যায়, পাকিস্তান আমলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ছিল ২৫ বছর আর অবসরের বয়স ছিল ৫৫ বছর। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুর দিক থেকে চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স ২৭ বছর আর অবসরের বয়স ৫৭ বছর করা হয়। ১৯৯১ সালে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩ বছর বাড়িয়ে ৩০-এ উন্নীত করা

হয়। ২০১২ সালে ২ বছর বাড়িয়ে অবসরের বয়স ৫৯ বছর করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়স করা হয় ৬০ বছর। এ দফায় অবসরের বয়স বাড়ানো হলেও প্রবেশের বয়স আর বাড়েনি। ফলে বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া, সেশনজট, নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে

নামেন শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীরা। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তারপরও দাবি আদায়ে ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধন, অনশন, মোমবাতি প্রজ্বালন, মশাল মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি, সনদ গলায় ঝুলিয়ে রিকশা মিছিলসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে আসছেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যেই ২০১৮ সালে জনপ্রশাসন

মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর জন্য কয়েক দফা সুপারিশ করা হয়। তখনকার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমও ওই বছরের ২০ আগস্ট সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর বিষয়টি সরকার ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। এন্ট্রিটা (চাকরিতে প্রবেশের বয়স) বাড়তে পারে, আশা করছি খুব

তাড়াতাড়ি জানতে পারবেন।’ এরপর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও বয়স বাড়ানোর বিষয়ে অঙ্গীকার করা হয়। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর বিষয়টি হারিয়ে যায়। অবশ্য গত ৪ সেপ্টেম্বর জার্মান রেডিও ডয়েচে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ও

অবসরের বয়সসীমা পুনর্বিন্যাসের সময় এসেছে। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৫ কিংবা ৪০ বছর করা যেতে পারে। এছাড়া অবসরের বয়সও ৬৫ করা যেতে পারে। এরপর প্রায় ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নড়াচড়া দেখা যায়নি। তাই চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়স বাড়িয়ে ৩৫ বছর করার দাবিতে জোরদার আন্দোলনের প্রস্তুতি

নিচ্ছে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠন। আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর নেতারা জানিয়েছেন, করোনা মহামারি পরিস্থিতির কারণে সব কিছুর মতো তাদের আন্দোলনেও স্থবিরতা নেমে ছিল। তবে এখন তারা দেশব্যাপী আন্দোলনে যাবেন। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র কল্যাণ পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মুজাম্মেল মিয়াজী বলেন, দেশে ৩০ লাখ বেকার রয়েছে। আমরা দাবি আদায়ে অহিংস আন্দোলন করে আসছি। আগামীতে আমরা জোরদার আন্দোলনে যাব। দাবি পূরণ না হলে ৬৪ জেলায় আন্দোলনের ডাক দেব। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন করেই যাব। সূত্রঃ ভোরের কাগজ

 আমাদের বিসিএস গ্রুপে যোগ দিন

আপনার মতামত লিখুন :