বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন প্রসঙ্গে

বেকার জীবনবেকার জীবন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  06:13 PM, 18 August 2021

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকগণ বদলির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। বিশেষ করে এনটিআরসি’র সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দূর-দূরান্তে নিয়োগ নিয়ে কর্মরত শিক্ষকগণের বদলির দাবি সর্বাধিক উচ্চারিত। বাস্তবে নিবন্ধন এবং অনিবন্ধিত উভয় প্রকার ইনডেক্সধারী শিক্ষকের ক্ষেত্রেই বদলি অত্যাবশ্যক। এই দাবিটি তাদের প্রয়োজনের দিক থেকে খুবই মানবিক ও যৌক্তিক। চাকরিতে বদলির সুযোগ একদিকে কর্মীর অধিকার, অপরদিকে কর্তৃপক্ষের হাতিয়ার। সুযোগ থাকলে যেমন কর্মী উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে তার পছন্দমতো স্থানে বা দপ্তরে যেতে পারেন, তেমনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে বা শাস্তিস্বরূপ কর্মীকে অন্যত্র বদলি করতে পারে। এই ব্যবস্থাটি বিশ্বস্বীকৃত। যা একই প্রতিষ্ঠানে/সংস্থায়/ব্যাংকে/এনজিওতে কর্মরত বিভিন্ন দপ্তর ও শাখার কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

বেসরকারি শিক্ষকদের যে পরিমাণ বেতন-ভাতা দেওয়া হয় তাতে নিজ বাড়ি থেকে দূর-দূরান্তে অবস্থান করে জীবনধারণ করা মোটেও সম্ভব নয়! বদলি বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের জীবনে যদি সামান্যতম স্বস্তি বৃদ্ধি করা যায় তো অবশ্যই কিছুটা বৃদ্ধি পাবে সার্বিক শিক্ষার মান। এনটিআরসিএ সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন আশা করি।

অপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিনে গড়ে উঠা ও বেড়ে চলা আমাদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এখনই তেমন সার্বজনীন বদলির সুযোগ দেওয়া খুবই কঠিন। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ, বেতনভাতা, পদোন্নতি, শাস্তি ইত্যাদি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি সরকারি বেতনভাতাও আলাদা কমিটির মাধ্যমেই প্রদান করা হয়ে থাকে।

এমতাবস্থায় নতুন আইন ও নীতিমালা প্রবর্তন ব্যতীত বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। সম্ভবত এ কারণেই বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমপিও নীতিমালায় এমনকি উচ্চ আদালতেও ‘বদলি’ শব্দটির স্থলে ‘প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন’ কথাগুলো ব্যবহার করা হয়। আমাদের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তারা নীতিমালা প্রণয়ন করে বদলির বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ব্যবস্থা করার কথা বলে থাকেন। সরাসরি বদলির আদেশ দেন না বা দিতে পারেন না। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দীর্ঘ দিনেও হচ্ছে না সেই নীতিমালা প্রণয়ন, হচ্ছে না আমাদের বদলির ব্যবস্থা। এই আন্দোলনে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি বারবার! আমার জানা মতে বদলি প্রত্যাশীরাও সর্বজন গৃহীত একটি সুষ্ঠু নীতিমালা উপস্থাপন করতে পারেননি আজ অবধি। আমাদের সেই কাঙ্খিত নীতিমালা কতদিনে হবে, কী রকম হবে, কোন শিক্ষক কিভাবে বদলির সুযোগ পাবেন তা সম্পূর্ণই অনিশ্চিত!

বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাই বারবার উত্থাপন করতে হবে বদলির দাবি এবং সেইসাথে নিতে হবে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের বিদ্যমান সুযোগ। এমপিও নীতিমালা ২০২১ অনুসারে নিবন্ধনধারী এমপিওভুক্ত বা এমপিও বহির্ভূত শিক্ষকগণ অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন।

এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রকাশিত ৩য় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০২১ এও সেই সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের খুব বেশি সুযোগ পাননি বিদ্যমান শিক্ষকগণ। কেননা, নতুন শিক্ষক পদপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে বিদ্যমান অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পূর্বের নিবন্ধন পরীক্ষার নম্বরপত্র দিয়ে। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার কোন নম্বর পাননি বিদ্যমান শিক্ষকগণ! মোটেও যুক্তিযুক্ত নয় এ সকল বিষয়।

এদিকে জানা গেছে, তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশপ্রাপ্তদের চূড়ান্ত নিয়োগ শেষে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শূন্যপদের চাহিদা সংগ্রহ করা হবে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের জন্য চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এমপিও নীতিমালা অনুসারে আসন্ন চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতেও নিশ্চয়ই নিবন্ধনধারী এমপিওভুক্ত ও এমপিও বহির্ভূত শিক্ষকদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হবে অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ লাভের জন্য।

একজন বিদ্যমান শিক্ষককে যদি বদলির লক্ষ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নেওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়; নিয়োগ পেলে এমপিও ট্রানস্ফার/বদলি করার সুযোগ দেওয়া হয়; এমপিও ট্রানস্ফার/বদলি হলে পূর্ব অভিজ্ঞতা গণনা করা হয়; তাহলে তিনি কেন চাকরিপ্রার্থী তথা সম্ভাব্য শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন? তিনি তো নতুন করে চাকরি চাচ্ছেন না, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে চাচ্ছেন।

তিনি তো শিক্ষক হয়েই আছেন। তিনি চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে আবেদন করবেন কেন? যদি আবেদন করতেই হয় তো প্রতিযোগিতায় তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা গণনা ও মূল্যায়ন করা হবে না কেন? যেহেতু সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে বদলি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না সেহেতু বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই অধিক যুক্তিযুক্ত ও ন্যায় সঙ্গত নয় কি?

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রতিবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার আগে বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের একটা সুযোগ দেওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের এই সুযোগ পাওয়া বিদ্যমান শিক্ষকগণের অধিকার। বিদ্যমান শিক্ষকগণ প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে গিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন এটি মোটেও সম্মানজনক নয়, উচিত নয়। একজন বিদ্যমান শিক্ষক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে গিয়ে সম্ভাব্য শিক্ষকদের সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে গেলে প্রতিষ্ঠানে তার সম্মানহানি ঘটে। সে মর্মাহত হয় ও বিষণ্ণতায় ভোগে!

এমতাবস্থায় বিদ্যমান নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত উভয় প্রকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান শূন্য আসনে নতুন নিয়োগের পূর্বে স্বেচ্ছায় বদলির আবেদন চেয়ে এনটিআরসিএ প্রয়োজনমত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও একই বিষয়ে কর্মরত সমঅভিজ্ঞ ইন্ডেক্সধারী আগ্রহী শিক্ষকদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনলাইনে চয়েজ দিয়ে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

একই প্রতিষ্ঠানের একই বিষয়ে ও পদে একাধিক আবেদনকারীর মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইসিটি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রকাশনা, চারিত্রিক গুণাবলি, সহশিক্ষা ইত্যাদি (জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনের নীতি অনুসারে) এরসাথে দূরত্ব বা জেলা ও উপজেলা কোটা বিবেচনা করে অধিক পয়েন্ট প্রাপ্ত শিক্ষককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলির বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

এভাবে বদলি কার্যকর হবার পর যেসকল প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ সৃষ্টি হবে সেগুলোতে বিধিমোতাবেক নতুন নিয়োগ প্রদান করা হলে হ্রাস পাবে শূন্য পদ নির্ধারণের জটিলতা। কিছুটা হলেও লাঘব হবে বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকগণের কষ্ট ও অসন্তোষ! বেসরকারি শিক্ষকদের যে পরিমাণ বেতন-ভাতা দেওয়া হয় তাতে নিজ বাড়ি থেকে দূর-দূরান্তে অবস্থান করে জীবনধারণ করা মোটেও সম্ভব নয়! বদলি বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের জীবনে যদি সামান্যতম স্বস্তি বৃদ্ধি করা যায় তো অবশ্যই কিছুটা বৃদ্ধি পাবে সার্বিক শিক্ষার মান। এনটিআরসিএ সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন আশা করি।

লেখক:মোঃ রহমত উল্লাহ, অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।

 আমাদের বিসিএস গ্রুপে যোগ দিন

আপনার মতামত লিখুন :