ব্যবসার প্রথম পুঁজি ২ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা লস করেছি!

বেকার জীবনবেকার জীবন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  02:18 PM, 14 September 2020

নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য সপ্তম শ্রেণি থেকেই টিউশনি শুরু করেন। এসএসসি পাস করার পর কখনো আর পরিবার থেকে এক টাকাও পাননি। বরং পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করেছেন। পাশাপাশি চালিয়েছেন নিজের পড়াশোনা। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতেন একদিন অনেক বড় হবেন। অার্থিক দৈন্যতা ঘুচাবেন। পরিবারের সবার মুখে হাসি ফুটাবেন। সেই থেকেই ব্যবসা করার চিন্তা মাথায় চেপে বসে। কিন্তু ব্যবসা করবেন বললেই তো হয় না।

অর্থ নেই, অভিজ্ঞতাও নেই। প্রতিকূল স্রোতে লড়াই করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন সংগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধুর কাছে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ করে নেমেছিলেন ব্যবসায়। অনভিজ্ঞতার কারণে মাত্র সপ্তাহখানেকের মধ্যে পুরো টাকাটা হাতছাড়া হয় তার। একে বারেই শূন্য হাত। অন্য কেউ হলে হয়তো হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু বন্ধুর কাছে ঋণ নেওয়া টাকা হাতছাড়া হওয়ার পর জেদ চেপে যায় ভিতরে। সিদ্ধান্ত নেন, যেকোন কিছুর বিনিময়ে ঋণ শোধ করতে হবে তাকে। তারপর এক কঠিন ইতিহাস।

কঠোর পরিশ্রম, সততা, লক্ষে স্থির থাকায় শূন্য থেকে আজকে ব্যবসার শীর্ষে। এতোক্ষণ যার সম্পর্কে বলা হচ্ছিল। তিনি হলেন- রড ও সিমেন্ট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মেট্রোসিমের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। মেট্রোসিম- সিমেন্ট, রড, ব্রিকস, শিপিং, প্রপার্টিজসহ ছয়টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে ও দেশের বাইরে ব্যবসা করছেন। পাশাপাশি রড ও সিমেন্ট প্রস্তুতকারী দুটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকও তিনি।

অামার ছোট বেলার পরিশ্রমের কথা বলেছি। তখন থেকেই অামার মধ্যে ব্যবসা করার একটা তীব্র ঝোঁক ছিল। ১৯৮৬ সালে মাস্টার্স পাস করার পর একটা বীমা কোম্পানিতে চাকরি নেই। চাকরি নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো কর্মজীবনটাকে বুঝা। মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, কাজ কর্ম রপ্ত করা। পাশাপাশি অামি বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ে প্রচুর খোঁজ খবর নিতাম। ব্যবসা নিয়ে পড়াশোনা করতাম। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরিচিত হতাম। বীমা কোম্পানির চাকরিটা এক বছর করার পর ছেড়ে দেই।

তখন অামার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধু অাবুল কাসেমের সঙ্গে একটা ব্যবসায়ী পরিকল্পনা করি। তাকে জানাই টাকার ব্যবস্থা করতে পারলে এমন একটা ব্যবসা করা সম্ভব। সে অামাকে জানায় তার এ্যাকাউন্টে কিছু টাকা অাছে। অামি চাইলে তার টাকাটা নিতে পারি। তখন তার কাছ থেকে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে নারকেল তেলের ব্যবসা করতে যাই। কিন্তু ব্যবসা ভালো বুঝতাম না। তার ওপর তখন এরশাদ সরকারের অামল। কোন এক জটিলতায় একটা ভুল করে ফেলি। ফলে পুরো দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অামার হাত ছাড়া হয়।

অামার হাতে তখন একটা টাকাও নেই। একদিকে টাকা হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে বন্ধুত্বের সম্মান। কঠিন পরীক্ষা অামার সামনে। কারণ, ১৯৮৮ সালের প্রেক্ষাপটে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা অনেক বড় সংখ্যা। অামার বন্ধুটি বিনা শর্তে, বিনা বাক্য ব্যয়ে নিজ থেকে অামাকে টাকা দিয়েছে। এটা অনেক বড় বিশ্বাসের ব্যাপার। ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক এই টাকা ফেরত দিতে হবে। অামার মুন্সীগঞ্জের অারেক বন্ধু, একেবারে বাল্য বন্ধু তৈয়ব অালী। তার সঙ্গে বিষয়টা পরামর্শ করলাম।

সে বলল, বন্ধু তোমাকে অামি দেড় লাখ টাকা দিতে পারি। সেই টাকা নিয়ে শুরু করলাম ঢেউটিনের ব্যবসা। অাপনারা জানেন, তখন গ্রামে-মফস্বলে ঢেউটিনের প্রচুর চাহিদা ছিল। অামি মূলত পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা শুরু করি। অাল্লাহ অামার ওপর সহায় ছিলেন। বাবা মায়ের দোয়া ছিল। অামি শুধু পরিশ্রম করে গেছি। অাপ্রাণ চেষ্টা করেছি ব্যবসা করতে গিয়ে সৎ থাকতে। ব্যবসায়ে সততার চেয়ে বড় পুঁজি অার নেই। অামি এখনো সেই পরিশ্রম করে যাচ্ছি।

১৯৯০ সালে অামি চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকায় ব্যবসা শুরু করি। পাশাপাশি শুরু করি এমএস রড ব্যবসা। অামি কিন্তু তখনো ম্যানুফ্যকচারিং এ যাইনি। যারা ম্যানুফ্যকচার করে তাদের কাছ থেকে পাইকারী দরে কিনে নিয়ে পরিবেশক হিসেবে বিক্রি করতাম। এভাবে ভালোই চলছিল। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে দেখা গেল বাজারে ঢেউটিনের চাহিদা কমছে।

২০০২ সালের দিকে অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। মানুষ টিনের ঘর অার তৈরি করছে না। সবাই পাকা ঘর করছে। ফলে চাহিদা বাড়ছে রড সিমেন্টের। যেহেতু অামি ব্যবসায়ী হিসেবে দেশের ৬২টি জেলা সফর করেছি। সেহেতু সব অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ২০০২ সালে সিমেন্ট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মেট্রোসিম নাম নিয়ে অামরা সিমেন্ট উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত হই। পাশাপাশি অামাদের ঢেউটিনের ব্যবসা ছিল।

অামরা যখন সিমেন্ট উৎপাদনে অাসি তখন দেশে সিমেন্টের বার্ষিক চাহিদা ছিল মাত্র ১.৫ মিলিয়ন টন। এখানে বলে রাখা ভালো ১৯৯৫-৯৬ সালের অাগে সিমেন্ট বিদেশ থেকে অামদানি করে এদেশে অানা হতো। অামরা যখন উৎপাদন শুরু করি তখন প্রতিদিন উৎপাদন করতাম প্রায় ৮০০ মেট্রিক টন। সেই উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে সারা দেশে বাজারজাত শুরু করি। ২০১৪ সাল থেকে অামরা প্রতিদিন এক হাজার ৮০০ মেট্রিক টন উৎপাদন শুরু করি। বর্তমানে অামাদের উৎপাদন করতে হচ্ছে প্রতিদিন দুই হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। দেশের বাইরে ভারতে অামরা নিয়মিত সিমেন্ট রফতানি করছি।

বেকারত্ব একটা কঠিন অভিশাপ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি খুঁজতে খুঁজতে তাদের প্রচুর সময় ও শক্তি নষ্ট হয়। অনেক সময় হতাশা অাসে। কিন্তু অামাদের সময়ের প্রেক্ষাপট ও এখনকার প্রেক্ষাপট এক না। অামাদের সময়ে একজন নতুন উদ্যোক্তাকে প্রথম যে বাধাটির মুখোমুখি হতে হতো তা হলো ফিন্যান্স। কিন্তু এখন এই সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। দেশে বর্তমানে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক অাছে। যারা তরুণদের সহজ শর্তে লোন দিচ্ছে।

এখন প্রযুক্তি অনেক সহজ। অামদানি-রফতানির ক্ষেত্রে যোগাযোগ কোনো কঠিন কাজ না। লেনদেন সহজ। তড়িৎ গতিতে হয়ে যায়। কেউ ব্যবসায়ী হতে চাইলে বা কেউ যদি স্বপ্ন দেখে ভবিষ্যতে নিজেকে শিল্পপতি হিসেবে গড়ে তুলবে তাহলে তার প্রথম যে জিনিশটা থাকা দরকার তা হলো ইচ্ছাশক্তি। এরপরে দরকার অাত্মবিশ্বাস। সততা ও পরিশ্রম করার মানসিকতা ভীষণ দরকার। এদুটো ছাড়া কোনো বাধা অতিক্রম করা যাবে না।

এখনকার তরুণ উদ্যোক্তাদের দুটি জিনিসের অভাব দেখা যায়। এক. তাদের মধ্যে ধৈর্যের অভাব। ভীষণ অস্থির প্রকৃতির। কোনো একটা ব্যবসায়ে ফেল করলে তারা গতি পাল্টায়। এটা খুব খারাপ। ধাক্কা খেতে খেতেই সফলতার মুখ দেখবে এই মানসিকতা থাকতে হয়। অারেকটা খারাপ অভ্যাস হলো রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হওয়ার বাসনা। একজন উঠতি ব্যবসায়ীর জন্য এটা ভালো বৈশিষ্ট্য নয়। সততা, পরিশ্রম ও অাত্মবিশ্বাস থাকলে সফলতা অাসবেই।

মেট্রোসিম একটা ব্র্যান্ড। এটা ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে। তবে অামার কাছে মেট্রোসিম একটা স্বপ্নের নাম। একটু খুলে বলি। অামাদের অনেক ভাই বিদেশের মাটিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে দেশে টাকা পাঠায়। সেই ভাইদের একটা স্বপ্ন থাকে। স্বপ্নটা হলো দেশে এসে তারা একটা বাড়ি বানাবে। একটা বাস উপযোগী টেকসই ঘর নির্মাণ করবে। অার সেই ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত হয় রড, সিমেন্ট। একজন লোকের সারা জীবনের মাথার ঘাম মিশে অাছে যে টাকায় সে টাকা দিয়ে কেনা হবে রড সিমেন্ট। সেই রড সিমেন্ট যদি সম্মত না হয়, তার ঘরটা যদি টেকসই না হয় তাহলে অামি অামাকে ক্ষমা করবো কীভাবে।

এই বোধ অামরা লালন করি। অাল্লাহর রহমতে মেট্রোসিম পণ্যের গুণগত মান নিয়ে এখনো কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। পণ্যের সঠিক মানের ব্যাপারে অামাদের কোনো অাপোষ নেই। না, বললেই নয়। অামাদের দেশে উৎপাদিত রড, সিমেন্ট ব্যবহার করেই এখন পদ্মা সেতুর মতো ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে। গড়ে উঠছে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। এটা অনেক বড় ইতিবাচক দিক। এই বিবেচনায় অামরা গর্ব করে বলতে পারি, এদেশে উৎপাদিত রড সিমেন্ট একদিন সারা বিশ্ব বাজারে প্রভাব বিস্তার করবে।

অাল্লাহর রহমতে অাজীবন পরিশ্রম করতে চাই। সুনাম বজায় রেখে কাজ করতে চাই। অামি অাগে বলেছি, অামরা নয় ভাই। শুনলে অবাক হবেন, অামরা নয় ভাই মেট্রোসিম- পরিচালনা করি। সবাই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অামরা অামাদের প্রতিষ্ঠানে সব কর্মকর্তা কর্মচারীদের কাছে কৃতজ্ঞ। অামাদের ব্যবসায়ী সফলতার পেছনে তাদের শ্রম ও মেধা অাছে। নিজের দায়িত্ববোধ থেকে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। অামি সবার দোয়া প্রত্যাশী।

তথ্যসূত্র: একুশে টেলিভিশন অনলাইন।

 আমাদের বিসিএস গ্রুপে যোগ দিন

আপনার মতামত লিখুন :