মেধা নয়, স্মার্টনেস যাচাইয়ের পরীক্ষা হলো ভাইভা

বেকার জীবনবেকার জীবন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  06:00 PM, 11 June 2019

সর্বপ্রথমে মনে রাখবেন মৌখিক পরীক্ষা শুধু আপনার মেধা যাচাই নয় বরং আপনার ব্যক্তিত্ব, স্মার্টনেস, উপস্থাপনা, দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা যাচাইয়ের পরীক্ষা। আপনার পছন্দ যা-ই হোক না কেন, আপনার কাজ হলো পুরোটা সময় অফিসারসুলভ ব্যক্তিত্ব ধরে রেখে প্রমাণ করা আপনি ওই ক্যাডারে চাকরি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি— এভাবে বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা বোর্ডকে তুলে ধরেছেন মো. আতিকুর রহমান নাহিয়ান। সম্প্রতি ৩৭তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেছেন তিনি। দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের পক্ষ থেকে এম এম মুজাহিদ উদ্দীন তার সাথে ভাইভা অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ নিয়ে আলাপ করেছেন।

সর্বপ্রথমে মনে রাখবেন মৌখিক পরীক্ষা শুধু আপনার মেধা যাচাই নয় বরং আপনার ব্যক্তিত্ব, স্মার্টনেস, উপস্থাপনা, দৃষ্টিভঙ্গী, মানসিকতা যাচাইয়ের পরীক্ষা। আপনি কয়টি প্রশ্নের মধ্যে কয়টি প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছেন এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তার চেয়ে হাজারগুণ জরুরি আপনার আ্যটিটিউড, প্রশ্নটা আপনি সঠিকভাবে রিসিভ করতে পারছেন কিনা এবং উত্তর না পারলে বা অল্প জানা থাকলে সেই বিষয়টা আপনি কিভাবে ম্যানেজ করছেন। অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েও আপনি ভালো নম্বর নাও পেতে পারেন যদি আপনি পজিটিভ ও প্রগ্রেসিভ মেন্টালিটি ধারণ না করেন।

ভাইভার প্রস্তুতি নির্দিষ্ট বইয়ের নির্দিষ্ট কিছু টপিক পড়ে অর্জন করা সম্ভব নয়৷ভাইভার প্রস্তুতি নেয়ার অর্থ হলো আপনার সার্বিক ব্যক্তিত্বের বিকাশ।সেজন্য পথমেই চাই ভাষাগত দক্ষতা অর্জন। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় কথা বলার দক্ষতা অর্জন করতে হবে৷ প্রশ্নকর্তা যে ভাষায় প্রশ্ন করবেন আপনাকে সেই ভাষায় উত্তর দিতে হবে।

অনেকের ধারণা যাদের প্রথম পছন্দ ফরেন ক্যাডার তাদের ইংরেজিতে প্রশ্ন করা হয়৷ব্যাপারটি এমন নয়, ইংরেজিতে অন্তত স্বাভাবিকভাবে কথোপকথন চালানোর দক্ষতা আপনার থাকা চাই৷ বাংলার ক্ষেত্রে সুন্দর বাচনভঙ্গী ও প্রমিত বাংলার ব্যবহার জানা জরুরি। বিশেষ করে আঞ্চলিক টান এবং ইংরেজি বাংলার সংমিশ্রণে বাংরেজি ব্যবহার হতে বিরত থাকা অনুশীলন করুন। যথাযথ শব্দ ব্যবহার করাও বিশেষ দক্ষতা। যেমন প্রশ্নের উত্তর না পারলে -পড়ি নাই, জানি না, সঠিকভাবে জানা নেই কিংবা মনে করতে পারছি না যেকোনোটাই আপনি বলতে পারেন। কিন্তু কোনটি বেছে নেয়া যথাযথ সেটি আপনাকে শিখতে হবে ৷

জাতির পিতাকে সম্মোধন করার সময় অনেকে শুধু বঙ্গবন্ধু বা শেখ মুজিব বলেন এই ধরনের ভুলও ভাষাগত অদক্ষতা৷ আমি এই বিষয়গুলো নিয়ে নিজে নিজে অনুশীলন করেছি। মোবাইলে কমন প্রশ্নগুলোর উত্তর রেডি করে রেকর্ড করে শুনুন। কোথায় উচ্চারণগত দুর্বলতা আছে ধরতে পারবেন, সংশোধন করতে পারবেন আর বারবার শুনলে উত্তরটি দারুণভাবে আত্ত্বস্থও হবে

চারটিভাগে আমি আমার ভাইভা নোট খাতা প্রস্তুত করেছিলাম— ফার্স্ট চয়েজ, নিজ সাবজেক্ট, কমন বিষয়াবলী (নিজ জেলা, কেন সিভিল সার্ভিসে আসতে চাও ইত্যাদি) মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ। এছাড়া সাম্প্রতিক বিষয়গুলো ভাইভা নোটে তুলে রাখতাম।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে ‘you never get a second chance to make a first impression’ আপনি ভাইভা বোর্ডে প্রবেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আপনার সম্পর্কে সাব-কনশাসলি একটা সিদ্ধান্তে আসবেন। সুতরাং প্রথমেই ভালো ইম্প্রেশন তৈরী করতে পারলে আপনার ৬০ ভাগ কাজ হয়ে গেল। আপনার পোশাক এবং আদব কায়দা নিয়ে সচেতন থাকুন। শীতের সময় ভাইভা হওয়াতে আমি স্যুট, টাই পড়ে গিয়েছিলাম। ভাইভা বোর্ডে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করবেন, সালাম দিবেন এবং অনুমতি নিয়ে বসবেন৷ ইনফরমাল আলোচনায় আমি সাধারণত হাত নেড়ে কথা বলি কিন্তু ভাইভাতে যেন তা না হয় তাই আমি এক হাত দিয়ে অন্য হাত ‘ইন্টারলকড’ করে বসেছিলাম। আমি শুধুমাত্র প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে উত্তর করিনি বরং কথার মাঝে অন্যদের সাথেও আই কন্টাক্ট রাখতে চেষ্টা করেছিলাম। সবচেয়ে জরুরি বিষয়— মুখে সর্বদা একটা স্মিত হাসি ধরে রাখা। এই পজেটিভ আ্যটিটিউড আপনার সম্পর্কে বোর্ডকে পজেটিভ রাখবে। আমি ৩৭তম ভাইভা বোর্ডে প্রায় ৩৫ মিনিট ছিলাম, এক মূহুর্তের জন্যেই স্মাইলিং ফেস ধরে রাখতে ভুলিনি।

আমাকে প্রথমেই বলা হয়েছিল ‘introduce yourself’ এইখানে আ্যকাডেমিক, পারিবারিক বিষয়ের সাথে নিজের শক্তির জায়গাগুলো ফোকাস করুন। আমার বোন নেই শুনে পরবর্তী প্রশ্ন করা হয়— আমার বোন থাকলে সম্পত্তির অর্ধেক যদি বাবা বোনকে দিয়ে দিতেন আমার আপত্তি ছিল কিনা? কেন আপত্তি নেই ব্যাখ্যা করতে বলা হলো। সিডো, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন হলো। আমি প্রগ্রেসিভ মেন্টালিটি ধারণ করি কিনা বোঝার জন্য এই প্রশ্নগুলো করা হয়েছিল।

তারপর কেন পুলিশ ক্যাডার প্রথম পছন্দ জানতে চাওয়া হয়? আমার পূর্বের সার্ভিসে আমি কি ধরনের কাজ করেছি বোর্ড জানতে চান। মনে রাখবেন আগে যদি কোনো চাকরিতে থাকেন এবং সেইটা উল্লেখ থাকে অবশ্যই আপনার কাজের ধরন এবং ঐ বিষয়ের মৌলিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হবে।

নিজের পছন্দ ক্রমের ১ম তিনটা ক্যাডার নিয়ে অল্প হলেও জেনে যাবেন। যেমন আমাকে তৃতীয় পছন্দের পদক্রম জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। বোথ ক্যাডার চয়েজ থাকুক বা না থাকুক নিজের অনার্স/ মাস্টার্সের সাবজেক্টের ব্যাসিক সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখুন। আপনি অন্য বিষয় নাই জানতে পারেন কিন্ত নিজ সাবজেক্টের প্রশ্ন না পারাটা ভাইভা বোর্ড খুব নেগেটিভভাবে নেয়৷

জাতির পিতার জীবন এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন আসবেই। অন্তত মুক্তিযুদ্ধের কিছু বই এবং অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে যাবেন৷ আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের, যুক্তরাষ্ট্রের, যুক্তরাজ্যের এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের নাম জানতে চাওয়া হয়েছিল। ভারতের প্রেসিডেন্টের পুরোনাম উল্লেখ করাতে ভাইভা বোর্ড খুশি হয়েছিল৷ আমাকে বলেছিলো ভিভি গিরির পুরো নাম তো আমরাই জানতাম না।

স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বা বিশদ আলোচনা করবেন না। ভাইভা বোর্ডে বিনয়ী থাকা ফরজ। পরিস্থিতি যেমনই হোক আপনি সর্বোচ্চ বিনয় প্রদর্শন করবেন। আপনার চোখ মুখ দেখে মনে হবে আপনি একজন উৎসাহী শ্রোতা। বোর্ড মেম্বাররা আপনার উত্তরের সাথে অনেক কিছু যোগ করবেন সেগুলো উৎসাহ নিয়ে শুনুন। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিরোধপূর্ণ ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন করলে কখনোই সরাসরি আপনার দর্শন ব্যক্ত করবেন না। সেক্ষেত্রে কৌশলে তথ্য উপস্থাপন করুন, মতামত নয়। ভাইভা বোর্ড আপনাকে দ্বিধান্বিত করার চেষ্টা করবে। মৎস্য সেক্টরে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বোর্ড আমাকে কনফিউজিড করার চেষ্টা করেছিল। নিজের উত্তরের ব্যাপারে কনফিডেন্ট থাকুন। স্টেটমেন্ট পরিবর্তন করবেন না। তবে তারা যদি কোনো সিদ্ধান্ত দেয় অর্থ্যাৎ আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করে কখনোই তর্কে জড়াবেন না। চুপচাপ মেনে নিন।

আপনি চাইলেই বোর্ডকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কীভাবে করবেন? আপনি যা বলবেন ভাইভা বোর্ড তা থেকে পরবর্তী প্রশ্ন করবে। সুতরাং খুব সূক্ষ্মভাবে আপনার দখলে থাকা তথ্য, টার্ম ইত্যাদি ব্যবহার করুন, যেনো তা থেকে পরবর্তী প্রশ্ন করা হয় ।

নিজের সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন থেকে বিরত থাকুন৷ যেমন ভাইভার এক পর্যায়ে আমি বলেছিলাম আমার বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরির ইচ্ছা ছিল না৷ বরং সেই ইচ্ছা গড়ে উঠেছে অনার্সের শেষ পর্যায়ে এসে। ভাইভা বোর্ড খুব পজিটিভলি নিয়েছিল৷ আগে কি ইচ্ছে ছিল এবং কেনো তা পরিবর্তন করলাম জানতে চেয়েছিল। এই পর্যায়ে পরিবেশটা এমন ছিল যেন আমি তাদের সাথে গল্প করছি। যদি আপনার শখ হয় সিনেমা দেখা/গিটার বাজানো হয় সেইটাই বলুন, বানিয়ে বই পড়া কিংবা নিউজ দেখা ইত্যাদি বলবেন না।

প্রথম পছন্দ ছিলো পুলিশ ক্যাডার হওয়াতে পেনাল কোড, সিআরপিসি আর পুলিশ আ্যক্ট থেকে কিছু প্রশ্ন করা হয়। আরো জানতে চাওয়া হয় বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মতামত কী? পুলিশ বর্তমানে কোন দুইটি বিষয়ের উপর বেশি জোর দিচ্ছে? সেভেন সিস্টার্স কারা? কেন ঐ অঞ্চল শান্ত আছে? সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা কী? সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কী? উদাহরণ? ডেভেলপমেন্ট কী? মিডল ইনকাম কান্ট্রি হতে কোন কোন শর্ত পূরণ করা দরকার? বোর্ড জেলার বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে জানতে চাইলেন আর আমার সাবজেক্ট থেকে অনেকগুলা প্রশ্ন করলেন।

আপনার পছন্দ যা-ই হোক না কেন, আপনার কাজ হলো পুরোটা সময় অফিসারসুলভ ব্যক্তিত্ব ধরে রেখে প্রমাণ করা আপনি ওই ক্যাডারে চাকরি পাওয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। সবাইকে শুভকামনা।

আপনার মতামত লিখুন :