শিক্ষক সংকট দূর করবে বদলি প্রথা

বেকার জীবনবেকার জীবন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  09:01 AM, 08 September 2021

শিক্ষা মানুষকে শিক্ষা দেয়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ উচিত শিক্ষা পায়। শিক্ষার রসদ দিয়ে আগামীর পথ চলা চাকা সচল থাকে। তাই তো শিক্ষার বাজারমূল্য বড়ই বেশি। যার বাজারমূল্য বেশি সেটা সবখানে পাওয়া ঠিক নয় আর তা পেলে মূল্য কমে যায়। তবে তা জনপ্রিয়তা পেতে পারে এটা ঠিক, কিন্তু মূল্যমান পেতে পারে না। দোয়েল বাংলাদেশের সবখানে পাওয়া যায়, জনশ্রুতি আছে, তাইতো জাতীয় পাখি। তাই বলে এ পাখিকে বহু মূল্যের বলা চলে না। হামিং বার্ড সবখানে, সবদিকে পাওয়া যায় না বলেই এর মূল্যমান বেশি। শিক্ষার ক্ষেত্রেও এমন একটা বিষয় আছে। শিক্ষা জনপ্রিয়তা পেয়েছে বটে, তবে শিক্ষার মূল্যমান আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। বছর বছর পাসের হারে গদগদ হয়ে অনেকেই বলেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। না, দেশ এগুচ্ছে না, পেছাচ্ছে। একজন দক্ষ শিক্ষিত নাগরিক তৈরিতে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। সংখ্যা বাড়ছে কেবলই, দক্ষতা বাড়ছে না। আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি একটি সর্বজনীন কাঠামোতে আসতে পারেনি। খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলা শিক্ষা ব্যবস্থা তাই হাঁটার আনন্দে মেতে উঠতে পারেনি।

২০১০ সালের শিক্ষানীতি আজও আমাদের সামনে শুধুই বাগাড়ম্বর করা কথার কথা হয়ে আছে। শিক্ষার পরিবর্তনে অনেক কথা হলেও কাজের কাজ প্রায় শূন্যের কোাঁয়। বিশ্ববাজারে দক্ষ জনশক্তির মূল্য, চাহিদা বা চাহিদা তৈরির ব্যাপক সম্ভাবনার যে মোাঁ দাগ স্পষ্ট হচ্ছে তা থেকে আমরা পিছিয়ে। শিক্ষা পরিকল্পনা হয় ঠিকই কিন্তু তা বাস্তবায়নে যত গড়িমসি। শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা সময় পেয়েছিলেন এক দশক। এই দশকে শিক্ষার কী পরিবর্তন হয়েছে তা জাতি অবলোকন করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই এক দশকে শিক্ষানীতি কেন কাগজে কলমেই নীরব হয়ে থাকল? এর দায় কার? সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আকাক্সক্ষা, আসক্তি কিংবা যোগ্যতার পরিমাপ বদলে যায়। ১০ বছর পর তাই এই শিক্ষানীতি আবার পরিবর্তনের সময় এসে গেল। বর্তমান বিশ্ব নিয়ত পরিবর্তনশীল।

পরিবর্তনের সামনে নিজেদের যোগ্যরূপে পরিগণিত করতে শিক্ষা পরিকল্পনা পরিবর্তনের দাবি রাখে। তাই ২০২১ সালে আবার শিক্ষানীতি নিয়ে প্রশ্ন চলছে। কঁাাঁছেঁড়া চলবে হয়তো কিছুদিন তারপর স্থবির হয়ে যাবে। শিক্ষার মান বাড়াতে প্রচেষ্টা-এটা বেশ ভালো। দেশকে এগিয়ে নিতে আজও কী শিক্ষার কোনো বিকল্প পথ তৈরি হয়েছে। আদৌ কী সম্ভব! না, তা সম্ভব না যেনেও শিক্ষাকে নিয়ে কেন এত উদাসীনতা। শিক্ষা নিয়ে যত নীতি হয়েছে ততবারই ভাবনায় জড়িয়ে যায়, এবার হয়তো একটা ভালো কিছু হতে চলেছে। কিন্তু হয় না! আর কবেই বা হবে। সকালটা দেখলেই তো সারাাঁ দিন কেমন যাবে বোঝা যায়। ২০১০ থেকে এক দশক পার হলো বলেই বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, শিক্ষানীতি আর প্রয়োজন নেই। যতটুকু আছে ততটুকুরই প্রায়োগিক রূপ পাক!

আবার নন-এমপিওদের এমপিও দিতে সবচেয়ে বেশি নিয়মের বাঁধনে বাঁধা হয়। বিধিবিধানের ঘেরাটোপে পড়ে শিক্ষকসমাজ বিভ্রান্ত হয়ে নামেন রাজপথে। এটা শিক্ষা ও শিক্ষককে জাতির সামনে হেয় করে। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় চলমান শিক্ষা কার্যক্রমে। এ তো নন-এমপিওদের দুঃখ গাঁথা। এবার একটু এমপিও শিক্ষকদের বিজয় গাঁথা বলতে পারলে ভালো লাগত কিন্তু না, বলা গেল না। দুখের কাহিনিই বলতে হচ্ছে।

দেশের প্রায় ৯৭ ভাগ বিদ্যার্থী এমপিও ও নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত। অথচ নন-এমপিওদের এমপিও দেওয়া থেকে গড়িমসি করা ও এমপিও শিক্ষকদের শতভাগ বেতন না দেওয়া প্রভৃতি শিক্ষা ব্যবস্থাকে জটিল করা জাতির জন্য ভালো খবর ছিল না। দীর্ঘ ৩৪ বছরের পর প্রথম সব এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ২০১৮ সালে পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট, ১০০ টাকার বাড়ি ভাড়া ১০০০ টাকা, ১৫০ টাকার চিকিৎসাভাতা ৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়।

শতভাগ বেতন প্রদান করা হলেও দীর্ঘ ১৭ বছরেও ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। কর্মচারীরা পায় বেতনের ৫০ শতাংশ। ২০১৮ সালে এমপিও শিক্ষকদের ভাগ্য ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য যা করা হয়েছিল তা কী শিক্ষকদের সম্মানিত করেছিল, নাকি শিক্ষক সমাজকে অলৌকিকভাবে হেনস্থা করা হয়েছিল। শিক্ষকরা সেদিন সব মেনে নিয়েছিল। কিছু না পাওয়ার চেয়ে কিছু পাওয়া ভালো বলেই হয়তো সব মেনে নেওয়া। কিন্তু শিক্ষক সমাজকে বিশেষ করে এমপিও বা নন-এমপিওদের নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল তা বোধ হয় আর কোনো দিন পরিবর্তন হওয়ার নয়। বাড়ি ভাড়া এক হাজার টাকায় কোথায় থাকা যায়? অসুস্থতায় চিকিৎসা মাত্র ৫০০ টাকা-হাস্যকর ব্যাপার। পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট সেটাও কী আধুনিক মানসম্মত? ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা-এটাও কী বাস্তব সম্মত? দুটি উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার কথা থাকলেও শুধু একটি উচ্চতর গ্রেড পেয়েই পরিতৃপ্ত থাকতে হচ্ছে। দীর্ঘ ২৯ বছরেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি প্রথা চালু করা যায়নি। এমপিও সকল শিক্ষকদের সমস্যা নিয়ে আজ না বলে কেবলমাত্র বদলি প্রথা নিয়ে বলা এখন যেন সময়ের দাবি।

বদলি-পদবাচ্যটিকে ভাঙলে দাঁড়ায় বদল+ই=বদলি। বোঝা যায় বদলির সঙ্গে বদল অর্থাৎ পরিবর্তন হওয়াকে বোঝায়। আর বদলির তাৎপর্য হলো কাক্সিক্ষত পরিবর্তনকেই বোঝায়। পৃথিবীর সবকিছুই বদল হয়। কুঁড়ি ফুটে ফুল হয়, ফল হয়। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ে। মানুষ শৈশব থেকে কৈশোরে, যৌবনে অবশেষে বার্ধক্যে পরিণত হয়-বদলে যায়।

শিক্ষা যদি একটি ঘরের সঙ্গে তুলনা করি আর সেই ঘরের জানালা, দরজা, ভেন্টিলেটর এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে বদলিকে। একটি ঘর বিনির্মাণ করলেই হলো না। ঘরের জানালা, দরজা বা ভেন্টিলেটর না থাকলে কেউ-ই সুস্থভাবে বসবাস করতে পারবে না। কেননা স্বাস্থ্য যে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি থাকলে ভালো থাকে না। যে ঘরের যত সার্কুলেশন ভালো সে ঘরে বসবাসের মজাই আলাদা। কিন্তু তাই বলে ঘর বানাতে গিয়ে আবার শুধু জানালা দরজা আর ভেন্টিলেটরের মহড়া দেখালে চলবে ন। ঘরকে মজবুত ও টেকসই বানাতে হলে পরিমাণমতো সব কিছুর প্রয়োজন। শিক্ষার সঙ্গে বদলি প্রয়োজন। শিক্ষা নামক ব্যবস্থার সার্কুলেশন ভালো হলে একদিকে শিক্ষক ও অপরদিকে শিক্ষার্থীর মনোজগতের বিকাশ হবে দারুণভাবে। একজন শিক্ষক মানে পাঠদান বা শিক্ষাদান কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকা। শিক্ষকের বেতন ও বোনাস সম্মানকর নয়! তাছাড়া প্রতিনিয়ত জীবনযাপনের ব্যয়ভার বাড়তেই আছে গাণিতিক হারে, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এই কারণে শিক্ষকরা এক্সট্রা আয়ের পথ খোঁজেন। শিক্ষকরা তো সবজির ব্যবসা করতে পারবেন না। আর এটা উনাদের পেশার সঙ্গে যায়ও না। তাই শিক্ষকমাত্রই ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট পড়ানো। এই প্রাইভেটের খারাপ ও ভালো দুটি দিকই আছে। ভালো দিক হচ্ছে শিক্ষার্থীরা পড়া বুঝতে পারে বলা বোধ হয় অতিমাত্রায় বেশি হবে যে, এখনকার অনেক শিক্ষকই শ্রেণিকক্ষে ভালোভাবে পাঠদান করান না। এখন প্রশ্ন এই দোষটা শিক্ষক মাত্রই কী? উত্তরে বলা দরকার ‘না’। তবে বলা কর্তব্য, শিক্ষকদের বেতনের টাকা দিয়ে সংসারে চলে টানাপড়েন। অবশেষে প্রাইভেট পড়িয়ে সংসারের খরচটুকুন একটু সামলে নেওয়া-এটা কী দোষ? হ্যাঁ, এটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে দোষের। যেমন- কোনো কোনো শিক্ষক পড়ানোর নামে স্কুল কলেজে একটা আলাদা পরিবেশ তৈরি করেন। যারা শিক্ষকের কাছে পড়ে তারা বেশি নম্বর পায় কিংবা যারা শিক্ষকের কাছে পড়ে তারা পরীক্ষায় প্রশ্ন কমন পায় বেশি। আবার এমনো অভিযোগ আছে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ভালো না পড়িয়ে তার কাছে পড়তে আসতে বলেন-এটা দোষের। এখন অবশ্য এসব ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। এরকম অনেক এমএ, বিএ পাস করা ছাত্ররা কোচিং খুলে টাকা ইনকামের একটা রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। এসব কোচিং সেন্টারে শুধু একজন পড়ায় না এখানে সংশ্লিষ্ট সাবজেক্ট এর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সমস্ত কোচিং এ অনেক শিক্ষক কখনো নামে বা বেনামে যুক্ত থাকেন। আসলে শিক্ষকরা তো মানুষ তাই তাদের মৌল মানবিক চাহিদা ঠিকমতো পূরিত হচ্ছে না বিধায় তারা ভিন্নপথে ইনকামের রাস্তা খোঁজেন।

অনেক সময় একজন শিক্ষক একই স্কুল বা কলেজে চাকরি করতে করতে নিজেকে কোনো নেতা বা নেতাগোছের ব্যক্তি বলে মনে করেন-এটা সমাজের জন্য ভালো খবর নয়। সেসব শিক্ষকরা নেতার সঙ্গে যোগসাজশ করে সমাজে একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেন, যা শিক্ষক সমাজকে কলুষিত করে। মনিটরিং করলে দেখা যাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাসময়ে আসেন না আবার নিজের ক্লাসও সঠিকভাবে নেন না। আবার এমনও পাওয়া যাবে হঠাৎ করে এসে শিক্ষক হাজিরা খাতায় সহি করেন একটা নয়-যতদিন আসেননি ততদিনের। তার না আসা দিনের ঘরে প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ লাল কালি দিয়ে অনুপস্থিত লেখা তো দূরের কথা ‘এতদিন কেন আসেননি’ তার কৈফিয়ত পর্যন্ত চাইতে পারেন না। বলতে গেলে পাছে তারই গণেশ উল্টে যাওয়ার ভয়। বদলি হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসব নৈরাজ্য দূর করা যাবে।

বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ চলে ম্যানেজিং কমিটি (স্কুল) গভর্নিং বডি (কলেজ) যারা আবার রাজনৈতিক মদদপুষ্ট-এই বিষয়টি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তথা গোটা শিক্ষক সমাজকে একপ্রকার জিম্মি করেই রেখেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক চালানোর জন্যই তো ম্যানেজিং কমিটি, গভর্নিং বডির মতো দুর্বোধ্য শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। উনারা প্রতিষ্ঠানের উন্নতি করার কথা ভাবেন না, ভাবেন কখন কোন শিক্ষককে বাগে ফেলে বিপদে ফেলানো যায় টাকা হাতিয়ে নেওয়া যায়। শিক্ষকদের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ, ভয় দেখানো, বহিষ্কার, চাকরিচ্যুতি ইত্যাদি অনাকাক্সিক্ষত বিষয়গুলো থেকে শিক্ষক সমাজকে রক্ষা করতে হবে। সবসময় একটা ভয়, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি তথা সভাপতির ভয় স্কুল-কলেজগুলোকে ভালো রাখেনি। স্কুল কলেজের শিক্ষকরা এখন সন্ত্রাসীদের যতটা ভয় না পান, তারচেয়েও বেশি ভয় পান প্রতিষ্ঠানের সভাপতিকে। বর্তমানে প্রতিটি শিক্ষক যেন ভয়ের রাজ্যের এক একজন ভয়ার্ত শিক্ষাগুরু। শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় ভয় থাকা চলে না। পাঠদান স্বাধীনভাবে হওয়া চাই। নইলে যে বিদ্যার্থীরা বিদ্যা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে। বদলি প্রথা চালু হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসব ভয় অনেকাংশে কমানো যাবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুষ্ঠু ও সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা ও পরিচালনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় মাথা খাটিয়ে একটি ম্যানুয়াল তৈরি করলেই তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সভাপতি নামক হায়েনা থেকে রক্ষা পেত। শিক্ষার পরিবেশ নিরিবিলি হতো।

অনেকেই সেই কবে থেকে বাড়ির পাশের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তাই শিক্ষক পাঠদানের ক্ষেত্রে কোনো নতুনত্ব ভাবনার বিস্তরণ ঘটাতে পারেননি। ‘এ্যায় কী পড়া ছিল বের কর’-পদ্ধতির পড়াতেই জড়িয়ে থাকেন। শিক্ষার্থীদের না শেখানো পদ্ধতিতে কুঠারাঘাত করতে ‘বদলি’ প্রথার কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না।

শহর ও গ্রামের শিক্ষকদের কোনো মিলনমেলা হয় না। একজন গ্রামের শিক্ষক যখন বদলি হয়ে শহরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হয়ে যাবেন তখন গ্রামের না পড়–য়া শিক্ষকরা পড়বেন, অজানাকে জানবেন-সমৃদ্ধ হয়েই পাঠদান করাবেন। কারণ শহরের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি জানার আগ্রহ বা অনেক বেশি শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে এগিয়ে থাকে। আবার শহরের কোনো শিক্ষক যখন গ্রামের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান করাবেন তা অবশ্যই স্বাস্থ্যপ্রদ হবে বলেই বিশ্বাস। এভাবেই শহর ও গ্রামের মাঝে ভেদ রেখা দূর হবে শিক্ষার ভিতরে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

শিক্ষার ভিতরের দীনতা সবার আগে দূর করতে হবে। কলের গান শুনে যখন আর কারও মন ভরে না, তখন নিত্য নতুন আবিষ্কার হলো টেপ রেকর্ডার, সিডি, ভিসিআর, ভিসিপিসহ আরও কত কী! একসময় বিটিভিতে প্রতি সপ্তাহে একটা করে চলচ্চিত্র দেখানো হতো গোটা গ্রামের মানুষ, শুধু গ্রাম কেন শহরের অনেক মানুষ সেসব জম্পেস করে উপভোগ করত। সে সময়ও গেল। এখন কত চ্যানেল কত সিনেমা কিন্তু সেভাবে কেউ আর চলচ্চিত্র দেখে না। কত সিনেমা হল ছিল। মানুষ টিকিট কিনে বড় পর্দায় ছবি দেখত। সেই শিল্পও নিভু নিভু। ছবির রিলের মতোই জীবনের অনেক কিছুই ঘুরে গেছে, ঘুরে যাওয়াই ধর্ম। সেখানে শিক্ষা নিয়ত পরিবর্তনশীল হওয়াই আদর্শ।

শিক্ষার পরিবর্তন মানে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থারই পরিবর্তন হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে যেভাবে পরিবর্তনের ঊর্ধ্বমুখীতা লক্ষণীয় সে হারে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না। অসুখ না বুঝলে চিকিৎসা কীভাবে হবে। শিক্ষাকে কেবল কেরানি বানানোর জন্য না ভেবে বিশ্বের প্রতিযোগিতায় নিজেদের উপযুক্ত করে বানানোর হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করতে হলে শিক্ষার নানান বিষয় নিয়ে কাজ করতে হবে। শিক্ষা, শিক্ষার আবহ ও প্রেক্ষাপটকে সনাতনী ভাব থেকে সবার আগে মুক্ত করতে হবে। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের মন পবনের ঘাটে শিক্ষা নামক তরীতে বেঁধে রাখলে চলবে না, তরীকে সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাঝি সদৃশ শিক্ষকদের নৌকা বাইবার শক্তি ও সাহস জোগাতে হবে। একদিকে শিক্ষকদেরকে সবার আগে মর্যাদার আসনে বসাতে হবে সেটা যত বেশি আর্থিক হয় ততই ভালো। এতে মেধাবীরাও এ পেশাতে আসতে আগ্রহী হবে। সত্যি কথা, অর্থের অভাব থাকলে কোনোকিছুই ভালো লাগে না।

শিক্ষকদের বেতনসহ যাবতীয় বিষয়াদি যদি পর্যাপ্ত হতো তাহলে শিক্ষকরা পরিবার চালনার ভাবনায় মনোনিবেশ না করে উপযুক্ত পাঠদানে গোটামনকে নিবিষ্ট করত। মন থেকে ভালো কিছু করার প্রেরণা আসত। আর সমাজের সম্মানের বেদিতে তো তারা আদি থেকে বসেই আছেন। একদিকে অর্থ আর একদিকে সম্মান সবমিলে শিক্ষার পরিবেশে চমৎকার আবহ তৈরি হতো।

বদলির মাধ্যমে একজন শিক্ষক নিজেকে বিভিন্ন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে সচেষ্ট হয়। এতে একদিকে শিক্ষকদের মনের বাড়ি প্রশ্বস্ত হবে আর অন্যদিকে নতুন নতুন শিক্ষার্থীর মাঝে নিজেকে মেলে ধরতে পারবে। ‘বদলি’ শিক্ষকদের অনভিপ্রেত আচরণের শাস্তি হিসেবেও করা যেতে পারে। শিক্ষকরা তো দোষে-গুণে মানুষ তারা যখন শাস্তিস্বরূপ বদলি পাবেন তখন কিন্তু নিজেকে শুধরে নিতে পারবেন-এতে শিক্ষা ও শিক্ষক দুজনেই এগিয়ে যাবে। শিক্ষক বদলি চাইলেই তাকে বদলি দেওয়াও ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে একটি যথাযথ দিকনির্দেশানমূলক ম্যানুয়াল থাকা চাই।

একজন শিক্ষক একটি প্রতিষ্ঠানে তিন থেকে পাঁচ বছর চাকরি করবেন। এবং পাঁচ বছর পর বদলির আবেদন করা যাবে ম্যানুয়ালে এটা রাখাও জরুরি হবে। ভালো মানের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যতিক্রমও করা যেতে পারে। আবার বদলি করতে হবে যেনে একজন শিক্ষকের চাকরির ৩০ কিংবা ৩৫ বছর হওয়ার পরেও বদলি করতে হবে এমন নিয়মও থাকা উচিত হবে না। একজন শিক্ষক দুবার বদলি হতে পারবেন এবং প্রথমবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পছন্দমতো দেশের যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর দ্বিতীয়বার শিক্ষকের পছন্দমতো প্রতিষ্ঠানে-এই নিয়মটি চালু হলে দারুণ হবে। শিক্ষাকাঠামো হয়ে যাবে মানসম্মত। শিক্ষকরা যখন জেনে যাবেন যে, বদলি হবেই। অতএব পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখাই ভালো। প্রস্তুতি হিসেবে শিক্ষক নিজেকে জ্ঞান ও গরিমায় সমৃদ্ধ হবেন। মানসিকভাবে তৈরি হবেন।

বাস্তব এক ঘটনা বলি, আমার এক পরিচিত জন সরকারি স্কুলের শিক্ষক। ভালো মানের শিক্ষক তিনি। ভালো পড়ান বলেই তার কাছে বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীরা স্যারের বাড়িতে প্রাইভেট পড়েন। আমি একদিন তার বাসাতে গিয়েছি। অবশ্য তিনি কোনো দাওয়াত দেননি। আমার কী হলো সেদিন স্যারের জন্য ভিতরে আনচান করছিল। আমি বিচলিত ভালোবাসায় তাকে না জানিয়ে বাড়িতে বান্দা হাজির হলো। স্যারের প্রাইভেট পড়ানোর ঘরটি আলাদা। আমি স্ববেগে উচ্ছ্বাসে দরজায় কড়া নাড়লাম। স্যারের স্ত্রী দরজা খুলেই বললেন, ‘আরে ভাই আপনি এসময়ে?’ উনার কথার কোনো উত্তর দিলাম না সোজা ঘরের ভিতর ঢুকে বসে পড়লাম। থাকলাম কিছু সময় একা একা। পাশের ঘরেই তিনি মানে যার কাছে এসেছি তার কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তিনি পড়াচ্ছেন। সব শুনছি। পড়ানোর এক পর্যায়ে তিনি বললেন, ‘শোনো বাবুরা তোমাদের কাছে আজ একটা কথা বলি, তোমরা যদি কোনো চাকরি নাও পাও তো কোনো দিন স্কুল কলেজের শিক্ষক হবে না। প্রয়োজনে ব্যবসা করবা, তবুও শিক্ষক হবে না।’ আহ্! আমি হতোদ্দ্যম, বাকরুদ্ধ-মনে হচ্ছে আমার টুঁটি কেউ চেপে ধরেছে। আমি বিচলিত ভালোবাসায় যার কাছে এলাম আর তিনি এমনভাবে বলছেন। আমার শূন্য খাঁ খাঁ মনে হঠাৎ ভারী বর্ষণ হয়ে চায়ের কাপ পিরিচের টুনটান আওয়াজ নিয়ে স্যারের স্ত্রী এলেন। অল্পক্ষণের মাঝে আমি বাস্তবে ফিরে এলাম। তারও কিছুসময় পরে স্যার এলেন। ভুলকি দিয়ে আমাকে দেখে আবার পড়ানো শুরু করলেন। বুঝলাম তিনি আমাকে থামতেই বললেন। থামলাম। ভিতরে কী যে হচ্ছে। চা পান করছি। পড়ানো শেষ হতেই তিনি (স্যার) আমার সামনে আসলেন। হাতে তখনো হোয়াইট বোর্ড মারকার পেন। স্যার আবার উঠলেন, এবার কিন্তু বললেন, আর একটি বসুন। আমি জাস্ট——। আবার আসলেন আবার বসলেন। অনেক কথা বললেন। আমি তাতে তৃপ্ত হলাম। কিন্তু মনের মধ্যে স্যারের সেই কথা ‘যা পারো তাই হইও, কিন্তু শিক্ষক হইও না’- আমাকে ভাবিয়ে তুলল। চিন্তার পাহাড় মাথায় নিয়ে ফিরলাম বাড়ি।

একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক হয়ে শিক্ষক সম্পর্কে মূল্যায়নের যে বিষবাষ্প তা একদিনে হয়নি। সেই কবে থেকে শিক্ষা চলছে দেশে? স্বাধীনতার আগের কথা বাদই দিলাম, স্বাধীনতার পরের দিনগুলোতে শিক্ষার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কী? হ্যাঁ হয়েছে। তবে তা কী আদৌ বাস্তবসম্মত হয়েছে। বছর বছর শিক্ষার নানান বুলি আমাদের তৃপ্ত করেছে কিন্তু তা বাস্তবে কতটুকু প্রায়োগিক রূপ পেয়েছে। না, পাচ্ছে না।

বদলির মাধ্যমে তাদের আর্থিক সুবিধা বাড়াতে হবে। তাহলে অনেক শিক্ষকই বদলি হওয়ার জন্য ইচ্ছে পোষণ করবেন। এটা অনেক ভালো বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে। বদলির মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ বদল হবে। ২০১৮ ও ২০২১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এমপিও নীতিমালায় বদলি পদ্ধতিকে ফলোআপ করে বলা হলেও আজও ফলো তো দূরের কথা সে বিষয়ে আলাপ হওয়ার কোনো খবরও শোনা যায় নি। শিক্ষক সংকট এখন একটি শিক্ষার বিকাশ ও প্রকাশ করাতে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যার সমাধান জটিল নয়। শিক্ষক নিয়োগ দিলেই হয়ে গেল। না, তা করা গেল না। এনটিআরসিএ এই কাজটি খুব সহজে ও যুক্তিযুক্তভাবেই করতে পারতেন। কিন্তু না, এখানেও হলো না কাজের কাজ। ইনডেক্সধারীরা একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে করতে একঘেঁয়ে হয়ে এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তিতে পছন্দের প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়াস চালালেন। অনেক শিক্ষকই সফল হলেন। আবার অনেকেই কাক্সিক্ষত প্রতিষ্ঠানে সুপারিশপ্রাপ্ত না হয়ে সেখানে গেলেন না। শিক্ষক সংকট কাল না, বরং প্রকট হলো। ইনডেক্সধারীরা যেহেতু বেশি নম্বরধারী তাই তারা আবার সুপারিশ প্রাপ্ত হলেন। আর কম নম্বরধারী নিবন্ধনধারীরা যে বেকারের আসনে ছিলেন সেখানেই আরও লেপটে গেলেন। ইনডেক্সধারীরা তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানে চলে গেলেন। তার থাকা প্রতিষ্ঠানটির পদ শূন্যই রয়ে গেল। তাহলে বিষয়টি দাঁড়াল, ঘুরে ফিরে একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা। এখানে বলা দরকার, ইনডেক্সধারীদের এনটিআরসিএ যদি গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করতে নিষেধ করতেন এবং বলতেন যে, বদলির জন্য পরে আবেদন চাওয়া হবে। তাহলে কিন্তু বেশ হতো। তা না করে ঢালাওভাবে আবেদন চাওয়া হলো।

এনটিআরসিএ’র এই কাজটি কতটুকু বেকারত্ব ঘোচাল তা আজ নিবন্ধনধারীমাত্রই হাড়ে হাড়ে বোঝেন। যদি বদলির ব্যবস্থা থাকত তবে তো ইনডেক্সধারীরা এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদনে ঝুঁকত না। সেক্ষেত্রে হয়তো বেকারত্বের থাপ্পড় খাওয়া নিবন্ধনধারীরা চাকরি নামক আলোকের রোশনাই পেত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সংকট কিছুটা হলেও কাটত। না, তা হয়নি বলেই একদিকে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সংকট কাটছে না। আর অন্যদিকে নিবন্ধিত বেকারদের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে। বলা দরকার, এনটিআরসিএ’র যে হালচাল তা পরিবর্তন করা জরুরি। বদলির জন্য আলাদা প্রোফাইল আর নিবন্ধিতদের আরেক প্রোফাইল করলে শিক্ষক সংকট ও শিক্ষা সংকট দুটিই দূর হবে। শিক্ষাদানের সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক আছে যেমন নিবিড়, তেমনি বদলির সঙ্গে সম্পর্ক শিক্ষকের সম্পর্ক হওয়া উচিত সুগভীর। প্রথম প্রথম ‘বদলি’র কার্যক্রম করতে কিছুটা হিমশিম খাওয়া লাগতে পারে। এতদিনের জমে থাকা কাজ কী সহজে করা যায়। তবে তা কিছু দিনের মধ্যে ঠিক হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তাব্যক্তিদের কাছে করজোরে মিনতি, কালক্ষেপণ না করে শিক্ষার মান উন্নত ও শিক্ষাকে বাস্তবভিত্তিক করতে ‘বদলি’র মতো মহৎ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

লেখক: গোলাম মোর্তুজা, প্রভাষক (বাংলা) মাসকাটাদীঘি স্কুল অ্যান্ড কলেজ শ্যামপুর, কাটাখালী, রাজশাহী।

 আমাদের বিসিএস গ্রুপে যোগ দিন

আপনার মতামত লিখুন :