সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ভাইভার জন্য ১০ পরামর্শ

বেকার জীবনবেকার জীবন
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  10:18 AM, 29 August 2020
সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ভাইভার জন্য ১০ পরামর্শ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নবম-দশম গ্রেডের নিয়োগে ভাইভায় বরাদ্দকৃত নম্বর ২৫। নিয়োগ পরীক্ষায় চাকরিপ্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিচলিত হয় ভাইভায়। ভাইভার প্রস্তুতির জন্য প্রার্থীদের দরকারি পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান সজীব।

১। পঠিত বিষয়ঃ ভাইভা বোর্ডে সর্বাধিক প্রশ্ন করা হয় সাধারণত এই অংশ থেকে। ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার পঠিত বিষয়ের মৌলিক ইস্যুগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করুন। প্রতিটি টার্ম উদাহরণসহ জানুন। ব্যাংকিং সেক্টরে আপনার পঠিত বিষয় কিভাবে প্রয়োগ করা হয়—জানুন। যদি ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়—এমন বিষয়ে পড়াশোনা করেন, তবে ওই বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান কিভাবে এখানে প্রয়োগ করবেন সেটাও জানার বিষয়। এ অংশের ভালো প্রস্তুতির জন্য আপনার পঠিত বিষয়ের গ্লোসারি (glossary) অংশ ভালোভাবে পড়ুন।

২। নিজ এলাকাঃ ভাইভা পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার আগে আপনার নিজ দক্ষতা, শক্তির জায়গা, দুর্বলতা, পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে ব্যক্তিগত জীবনের আলোকে উদাহরণসহ ধারণা রাখুন। আপনার পঠিত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলিও জেনে রাখুন। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা বিশিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জানুন। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদিতে নিজ এলাকার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ঘটনা থাকলে সেগুলোও জানা থাকতে হবে। নিজ এলাকার কবি-সাহিত্যিক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যাবসায়িক ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি, নদ-নদী, প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থান, ট্যুরিস্ট স্পট সম্পর্কিত তথ্যের ওপর নিজের দখল রাখুন।

৩। পদ ও প্রতিষ্ঠানঃ যে পদের ভাইভা পরীক্ষার মুখোমুখি হবেন, সে পদের কর্মকর্তার কাজ ও দায়-দায়িত্ব, সুযোগ-সুবিধা এবং সে পদ সম্পর্কে মূল্যায়ন আগে থেকেই জেনে যাবেন। বর্তমানে কোনো চাকরিতে বহাল থাকলে তা ছেড়ে কেন নতুন চাকরিতে আসতে চাচ্ছেন, এ ব্যাপারেও প্রশ্ন করা হতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের নাম, শাখা সংখ্যা, ওই ব্যাংকের ভিশন, মিশন, কাজ, উল্লেখযোগ্য অর্জন ইত্যাদি জেনে রাখা ভালো।

৪। ব্যাংকিং সেক্টরঃ কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত সরকারি-বেসরকারি, দেশি-বিদেশি, ইসলামিক ব্যাংকিং, তালিকাভুক্ত-অতালিকাভুক্ত, বিশেষায়িত ব্যাংক ও ব্যাংকসংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। বিভিন্ন ব্যাংকসংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুর ধরনের মধ্যকার পার্থক্যগুলো সম্পর্কেও পড়াশোনা করুন।জনতা ব্যাংক লিমিটেডে অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে (৪৬৪টি) নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ২০-২৯ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স

সিলেকশন কমিটি। এ ছাড়া করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই বাংলাদেশ ব্যাংকে অফিসার (জেনারেল) পদ (২০০টি), জনতা ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক লিমিটেডে অফিসার (জেনারেল) পদ (৮৮৯টি) এবং জনতা ব্যাংক লিমিটেডে অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার (এইও টেলর) পদের (৫৩৬টি) ভাইভাসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ভাইভা অনুষ্ঠিত হবে।

ব্যাংকিং সম্পর্কিত বিভিন্ন টার্ম, যেমন—Repo, Reverse Repo, Call Money, Bank Rate, Bank Note, SLR, CRR, T-bill, Loan, Mortgage, NPL, Deposit, Interest, Debit-Credit Card, Cheque, Bill, PO, Money Laundering, Clearing, BACH, RTGS, CAMELS Rating, LC, BoP, NOSTRO-VOSTRO Account, CASA, LIBOR, Mobile-Internet-Green-Retail Banking ইত্যাদিসহ গুরুত্বপূর্ণ টার্ম থেকে প্রশ্ন করা হতে পারে। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ও অর্থনৈতিক পরাশক্তির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম, গভর্নরের নাম, মুদ্রার নাম ভাইভায় জিজ্ঞেস করা হতে পারে।

৫। অর্থনীতিঃ আপনি যে বিষয়েই পড়াশোনা করে থাকুন না কেন, ব্যাংকের ভাইভা বোর্ডে যাওয়ার আগে অর্থনীতির একবারে মৌলিক ইস্যু যেমন—মনিটারি পলিসি, ফিস্কেল পলিসি, বাজেট, জিডিপি, জিএনপি, মাথাপিছু আয়, ফরেন্স রিজার্ভ, বৈদেশিক রেমিট্যান্স, মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রা সংকোচন, মানি মাল্টিপ্লায়ার, ব্রড মানি, মানি মার্কেট, ক্যাপিটাল মার্কেট, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বৈদেশিক বিনিময় হার, চাহিদা, যোগান, আমদানি, রপ্তানি ইত্যাদি সম্পর্কে জানুন। এ ছাড়া আমাদের প্রধান অর্থনৈতিক খাত ও উপখাত সম্পর্কে ধারণা নিন। ধারণা নিন গার্মেন্ট সেক্টরসহ অন্যান্য রপ্তানিপণ্য সম্পর্কে।

৬। আন্তর্জাতিক সংস্থাঃ WB, IFM, ADB, IDB, NDV, ACU-সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ও বিস্তারিত ধারণা নিন। এ ক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নাম, কাজ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের উল্লেখযোগ্য কাজ কিংবা চুক্তি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। এ ছাড়া WTO, EU, NAFTA, APEC, OPEC, BRICS, G-7, G-20, SAARC, APG, NEXT-11, MERCOSUR, GCC, ASEAN ইত্যাদি সম্পর্কেও বিস্তর পড়াশোনা করুন।

৭। সাম্প্রতিক ঘটনাবলিঃ  দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখুন। এসব ঘটনা অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে পড়াশোনা করে বিশ্লেষণ করুন। যেমন—আমাদের গার্মেন্ট সেক্টর বা অর্থনীতির ওপর করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) প্রভাব; যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ ও ভারত-চীন বৈরী সম্পর্ক ইত্যাদি আমাদের অর্থনীতিকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে। করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ এবং আর কী

করণীয় বলে আপনি মনে করেন, সে সম্পর্কে ধারণা রাখুন। ব্যাংকিং সেক্টরে সাম্প্রতিককালে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু থাকলে তা জেনে রাখুন। সাম্প্রতি করোনার তথ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান WHO, IEDCR, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইত্যাদির বেসিক তথ্যও গুগলে সার্চ দিয়ে নোট করে রাখতে পারেন। সম্প্রতি প্রয়াত বিশিষ্ট নাগরিক বা আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও প্রশ্ন করা হতে পারে।

৮। ঐতিহাসিক বিষয়ঃ ব্যাংকের ভাইভায় অনেক সময় দেশীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা থেকেও প্রশ্ন করা হয়। এ অংশের প্রস্তুতির জন্য ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুথান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধসহ উল্লেখযোগ্য সব ঘটনা খেয়াল করে পড়ুন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সাল নোট করে রাখুন। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কেও পড়াশোনা করবেন।

৯। সহায়ক বইঃ ব্যাংক ভাইভা সম্পর্কিত বিভিন্ন বই বাজারে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ভাইভা সম্পর্কিত প্রসিদ্ধ প্রকাশনীর একটি বই কিনুন। বইটি থেকে একজন ভাইভাপ্রার্থীকে কী কী প্রশ্ন করা হয়ে থাকে তা দেখে যেসব প্রশ্নের উত্তর আপনার অজানা সেগুলোর উত্তর সংগ্রহপূর্বক খাতায় নোট করুন।

১০। করণীয় বর্জনীয়ঃ —ভাইভা হলো প্রার্থীর সঙ্গে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের একটি আনুষ্ঠানিক মৌখিক আলোচনা মাত্র। তাই আর দশটা আলাপচারিতার মতোই এটাকে বিবেচনা করুন এবং চাপমুক্ত থাকুন।—ভাইভার আগের রাতে যেন পর্যাপ্ত ঘুম হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।—ভাইভার আগের দিনই দরকারি কাগজপত্র গুছিয়ে রাখুন।—ছেলেরা স্যুট-টাইসহ সম্পূর্ণ অফিশিয়াল ড্রেস পরার চেষ্টা করুন। মেয়েরা মার্জিত ডিজাইনের শাড়ি বা থ্রিপিস পরুন। অতিরিক্ত অলংকার ও মেকআপ পরিহার করুন।

—ভাইভা বোর্ডের কক্ষে প্রবেশের আগে স্যারদের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করুন। কাছাকাছি গিয়ে স্বাভাবিক শব্দে (খুব উচ্চ শব্দে নয়) সালাম দিন, অনুমতি দেওয়ার পর বসুন অথবা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও বসতে না বললে বসার জন্য অনুমতি চাইবেন এবং বসার পর ধন্যবাদ জানান। কাত হয়ে, হেলে পড়ে, নুইয়ে বা রোবটিক ভঙ্গিতে বসবেন না; একজন ব্যাংক কর্মকর্তা তাঁর গ্রাহকের সামনে যেভাবে চেয়ারে বসা উচিত ঠিক সেভাবে বসুন।—পুরো প্রশ্ন শোনার পর উত্তর দেওয়া শুরু করুন। যিনি প্রশ্ন করবেন তাঁর দিকে চোখ রাখুন। বাংলায় প্রশ্ন করা হলে বাংলায়ই উত্তর দিন। আর ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলে ইংরেজিতেই জবাব দেওয়ার চেষ্টা করুন।

—উত্তর দেওয়ার সময় কৌশলী হোন। কারণ আপনার দেওয়া উত্তরের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশ্ন করা হতে পারে। আন্দাজে উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।—কোনো প্রশ্নের উত্তরে যতটুকু জানা আছে ততটুকুই বলুন। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে আদবের সঙ্গে বলুন, ‘স্যরি স্যার, এ ব্যাপারটা আমার জানা নেই।’—আপনার দেওয়া সঠিক উত্তরও যদি ভাইভা বোর্ডে সঠিক বলে গ্রহণ করা না হয়, তবে বিনয়ের সঙ্গে মেনে নিন এবং বলুন, ‘স্যরি স্যার, আমি এতটুকুই জানতাম।’—কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির

নাম জানতে চাইলে উক্ত নামের পূর্বে জনাব বা মাননীয় (যে যে ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য) এসব উল্লেখপূর্বক পূর্ণ/অফিশিয়াল নাম উল্লেখ করুন।—তাড়াহুড়ার দরকার নেই। খুব জোরে বা আস্তে নয়, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলুন।—ভাইভা শেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সালাম দিয়ে কক্ষ ত্যাগ করুন। তথ্যসূত্রঃ কালেরকন্ঠ, লেখকঃ এম এম মুজাহিদ উদ্দীন

 আমাদের বিসিএস গ্রুপে যোগ দিন

আপনার মতামত লিখুন :